Teacher Recruitment Interview Questions Answers: শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় লিখিত পর্বের মতোই ইন্টারভিউ বা মৌখিক পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল জ্ঞান যাচাইয়ের পরীক্ষা নয়, বরং আপনার ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য এবং পরিস্থিতির মোকাবিলা করার ক্ষমতা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম। বিশেষ করে SLST, Primary বা অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়, যা বেশ কৌশলী এবং বিভ্রান্তিকর হতে পারে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ইন্টারভিউ বোর্ডে জিজ্ঞাসিত এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং সেগুলোর স্মার্ট, নিরাপদ ও যুক্তিপূর্ণ উত্তর নিয়ে আলোচনা করব।
শিক্ষক নিয়োগ ইন্টারভিউ: কঠিন প্রশ্ন ও আদর্শ উত্তর
ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজেকে সৎ অথচ কৌশলীভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। নিচে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর সাজানো হলো।
১. শিক্ষক হিসেবে আপনার দুর্বলতা বা ত্রুটি কী?
এটি একটি সাধারণ কিন্তু কৌশলী প্রশ্ন। এখানে সরাসরি নিজের বড় কোনো নেতিবাচক দিক তুলে ধরা উচিত নয়। এমন উত্তর দিতে হবে যা আপাতদৃষ্টিতে দুর্বলতা মনে হলেও, পেশাগত ক্ষেত্রে সেটি আপনার ইতিবাচক গুণকেই প্রকাশ করে।
নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে বিষয়টি সহজ করে বোঝানো হলো:
| দুর্বলতার ধরন | ইন্টারভিউতে বলার কৌশল |
|---|---|
| নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা (Perfectionism) | বলতে পারেন, “আমি যেকোনো কাজ খুব নিখুঁতভাবে করতে চাই। এর ফলে মাঝে মাঝে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় লেগে যায় এবং আমি ব্যক্তিগত জীবনে চাপ অনুভব করি। কারণ ক্লাসের প্রস্তুতির জন্য আমি অতিরিক্ত সময় দিই।” |
| অনুভূতিপ্রবণতা (Emotional) | উত্তর হতে পারে, “আমি ছাত্রদের প্রতি একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। কাউকে শাসন করলে পরে আমার নিজেরই খারাপ লাগে। এটি আমাকে ছাত্রদের প্রতি যত্নশীল করে তুললেও ব্যক্তিগতভাবে আমি এতে কষ্ট পাই।” |
| অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতা | বলতে পারেন, “আমি কাজের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল। অনেক সময় সহকর্মীদের কাজও নিজের কাঁধে নিয়ে ফেলি, যা আমার ব্যক্তিগত সময় কমিয়ে দেয়। তবে এখন আমি কাজ ভাগ করে নিতে শিখছি।” |
২. ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় নাকি সহশিক্ষা (Co-education)?
বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের কথা মাথায় রেখে সবসময় সহশিক্ষা বা Co-education-এর পক্ষে যুক্তি দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
- সামাজিক ও মানসিক বিকাশ: বিদ্যালয় হলো সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি এবং একে অপরের প্রতি স্বাভাবিক আচরণ গড়ে ওঠে।
- বাস্তব জীবনের প্রস্তুতি: কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী ও পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হয়। সহশিক্ষা ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের এই পরিবেশের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
- লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ: আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় কৌতূহল থেকে নেতিবাচক ধারণা বা লিঙ্গবৈষম্যের জন্ম দেয়। সহশিক্ষা সমতার পরিবেশ নিশ্চিত করে।
৩. শখ হিসেবে ‘বই পড়া’ উল্লেখ করলে কী প্রস্তুতি নেবেন?
অনেকেই ইন্টারভিউতে শখ হিসেবে ‘বই পড়া’র কথা বলেন। এটি বললে আপনাকে অবশ্যই বিস্তারিত প্রস্তুত থাকতে হবে।
- কেন এই শখ: বই মানসিক প্রশান্তি দেয়, কল্পনাশক্তি বাড়ায় এবং নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
- প্রিয় লেখক ও বই: আপনার প্রিয় লেখকের নাম এবং তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত বই সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন। সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি বইয়ের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে গুছিয়ে বলতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও মানবতার এক অনবদ্য দলিল -এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
- শিক্ষায় ভূমিকা: বই পড়া একজন শিক্ষকের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে এবং পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
- বই বনাম মোবাইল: বই পড়া ধৈর্য ও একাগ্রতা বাড়ায়, যেখানে মোবাইল অনেক সময় মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে।
৪. সরকারি স্কুলে একই রঙের ইউনিফর্ম চালুর বিষয়ে আপনার মতামত কী?
সরকারি যেকোনো সিদ্ধান্ত বা নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সবসময় ইতিবাচক উত্তর দেওয়া উচিত।
- সামাজিক সমতা: একই রঙের ইউনিফর্ম বা পোশাক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর্থিক ভেদাভেদ দূর করে। কে ধনী বা কে গরিব, তা পোশাক দেখে বোঝা যায় না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয় না।
- একাত্মবোধ: নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যে একতা ও শৃঙ্খলার বোধ জাগিয়ে তোলে। তাদের পরিচয় হয় শুধুই ‘শিক্ষার্থী’, যা পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. কোনো শিক্ষার্থী আর্থিক কারণে স্কুল ছেড়ে কাজে যোগ দিলে আপনি কী করবেন?
একজন আদর্শ শিক্ষকের অন্যতম গুণ হলো সহানুভূতি এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা।
- কারণ অনুসন্ধান: প্রথমেই ছাত্রটিকে বকাঝকা না করে তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
- কাউন্সেলিং ও সমাধান: ছাত্র এবং তার পরিবারকে বোঝাতে হবে যে, কাজ শেখা বা করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা ভবিষ্যতের জন্য কতটা জরুরি। প্রয়োজনে তাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো এবং পার্ট-টাইম বা অন্য কোনো উপায়ে পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
৬. আপনি সরকারি স্কুলে চাকরিপ্রার্থী, কিন্তু আপনার সন্তান বেসরকারি স্কুলে কেন?
এটি ইন্টারভিউয়ের অন্যতম কঠিন এবং ব্যক্তিগত প্রশ্ন। এখানে মিথ্যা কথা না বলে সত্যের সাথে যুক্তি মেশাতে হবে।
- সময়ের সুবিধা ও লজিস্টিকস: উত্তর দিতে পারেন, “স্যার/ম্যাম, আমার বা আমার জীবনসঙ্গীর কাজের সময়ের সাথে বেসরকারি স্কুলের সময়সূচি এবং স্কুল ভ্যানের সুবিধাটি মানানসই ছিল, তাই প্রাথমিক ধাপে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
- প্রাক-প্রাথমিক যত্ন: বলতে পারেন, “সরকারি স্কুলে সাধারণত ৬ বছর বয়সে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি নেওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই শিশুকে স্কুলের পরিবেশ, নিয়মকানুন এবং সহ-পাঠক্রমিক কার্যকলাপে (যেমন আঁকা, গান) অভ্যস্ত করার জন্য আমি তাকে বেসরকারি প্রি-স্কুলে দিয়েছি।”
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: উত্তরের শেষে অবশ্যই যুক্ত করবেন, “তবে তার বয়স নির্দিষ্ট সীমায় (যেমন ৭ বছর) পৌঁছালে আমি তাকে অবশ্যই সরকারি স্কুলে ভর্তি করব। কারণ আমি বিশ্বাস করি সরকারি স্কুলই শিক্ষার মূল ভিত্তি এবং একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সেই মান উন্নয়নে সর্বদা সচেষ্ট থাকব।”
ইন্টারভিউ বোর্ডে আপনার উত্তর হতে হবে স্পষ্ট, বিনীত এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। কখনোই তর্কে জড়াবেন না এবং কোনো উত্তর জানা না থাকলে বিনীতভাবে তা স্বীকার করুন। সঠিক প্রস্তুতি এবং উপস্থিত বুদ্ধি আপনাকে সাফল্যের দুয়ারে পৌঁছে দেবে।
