K4 Submarine Launched Ballistic Missile India: সম্প্রতি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে ভারত একটি বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে ভারত তার পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পন্ন K4 ব্যালিস্টিক মিসাইলের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিসাইলটি ভারতের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিন এবং পাকিস্তানের দিক থেকে আসা যে কোনো হুমকির মোকাবিলায় ভারতের ‘নিউক্লিয়ার ডেটারেন্স’ বা পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এটি বহুগুণ শক্তিশালী করে তুলেছে।
K4 মিসাইল: বৈশিষ্ট্য এবং ভারতের কৌশলগত সুবিধা
ভারতের ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ বা জল, স্থল ও আকাশ—এই তিন মাধ্যম থেকে পারমাণবিক হামলা চালানোর ক্ষমতাকে পূর্ণতা দিতে K4 মিসাইল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা হলো:
- লঞ্চ প্ল্যাটফর্ম (SLBM): এটি একটি সাবমেরিন লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল (SLBM)। অর্থাৎ, জলের গভীরে থাকা সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা যায়।
- মারক ক্ষমতা (Range): এই মিসাইলটির পাল্লা বা রেঞ্জ প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার।
- কৌশলগত নমনীয়তা: যেহেতু এটি সমুদ্রের নিচ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়, তাই এটিকে ট্র্যাক করা বা ধ্বংস করা শত্রুপক্ষের রাডারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ হোক বা ভারত মহাসাগরের অন্য কোনো প্রান্ত, যেকোনো জায়গা থেকে এটি শত্রুর উপর আঘাত হানতে পারে।
- প্রধান লক্ষ্যবস্তু: এই ৩,৫০০ কিমি পাল্লার মাধ্যমে ভারত বঙ্গোপসাগর বা দক্ষিণ চিন সাগরে অবস্থান করেই চিনের বেইজিং সহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ শহরকে নিজের নিশানায় রাখতে সক্ষম।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান
বিশ্বে খুব কম দেশের হাতেই সাবমেরিন থেকে ৩,০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আঘাত হানার মতো প্রযুক্তি রয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত সেই অভিজাত দেশগুলোর তালিকায় নিজের স্থান আরও পোক্ত করল।
| দেশ | মিসাইলের নাম | আনুমানিক রেঞ্জ (কিমি) |
|---|---|---|
| আমেরিকা | ট্রাইডেন্ট ২ (Trident 2) | ১২,০০০ |
| রাশিয়া | বুলাভা (Bulava) | ১০,০০০ |
| চিন | JL-2 | ৭,০০০ |
| ফ্রান্স | M51 | ৮,০০০ |
| ভারত | K4 | ৩,৫০০ |
যদিও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারতের মিসাইলের রেঞ্জ কিছুটা কম, তবুও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এটি যথেষ্ট কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি: চিন ও বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া
ভারতের এই মিসাইল পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ও কৌতূহল দুই-ই বৃদ্ধি পেয়েছে।
১. চিনের নজরদারি: পরীক্ষার সময় চিন তাদের ‘রিসার্চ ভেসেল’ বা গবেষণা জাহাজ ভারত মহাসাগরে পাঠিয়েছিল। এই জাহাজগুলো মূলত গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত হয়। ভারত পরীক্ষার আগে একাধিকবার ‘নোটাম’ (NOTAM – Notice to Air Missions) জারি করে আবার বাতিল করেছিল, যা চিনের নজরদারি এড়ানোর জন্য একটি কৌশলগত “ইঁদুর-বিড়াল খেলা” ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২. বাংলাদেশের অবস্থান: প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান থেকে স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল (SRBM) কেনার চিন্তাভাবনা করছে। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তার জন্য একটি চিন্তার বিষয় হতে পারে।
ভারতীয় নৌসেনার শক্তিবৃদ্ধি
বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে এমন দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন রয়েছে যা K4 মিসাইল বহন করতে সক্ষম:
- আইএনএস আরিহন্ত (INS Arihant)
- আইএনএস আরিঘাট (INS Arighat)
এই সাবমেরিনগুলি হয় ৪টি করে K4 মিসাইল অথবা ১২টি করে K15 (সাগরিকা) মিসাইল বহন করতে পারে। K15 মিসাইলের রেঞ্জ তুলনামূলক কম (প্রায় ৭৫০ কিমি)। K4-এর সংযোজন ভারতকে নিশ্চিত ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ (Second Strike Capability) প্রদান করেছে। অর্থাৎ, যদি কখনও শত্রুপক্ষ ভারতের ওপর পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে ভারত সমুদ্রের গভীর থেকে পালটা এবং ধ্বংসাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম।
উপসংহার
K4 মিসাইলের সফল পরীক্ষা ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) এবং নৌবাহিনীর জন্য একটি বিশাল সাফল্য। এটি শুধুমাত্র একটি অস্ত্র পরীক্ষা নয়, বরং অশান্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ২০২৬ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ভারতের এই প্রস্তুতি ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
