India GDP Ranking: সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) একটি রিপোর্ট ঘিরে জাতীয় স্তরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির মঞ্চে ভারতের অবস্থানে কিছুটা রদবদল ঘটেছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির তকমা ধরে রাখলেও, নমিনাল জিডিপি র্যাঙ্কিংয়ে ভারত বর্তমানে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে।
তবে এই পরিবর্তন কি সত্যিই উদ্বেগের? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পতনের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা নেই, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে কিছু বাহ্যিক ও কারিগরি কারণ। বিশেষ করে যারা ইউপিএসসি বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এই অর্থনৈতিক ওঠানামার নেপথ্যের কারণগুলো বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
Table of Contents
নমিনাল জিডিপি বনাম পিপিপি: হিসাবের মারপ্যাঁচ
জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন পরিমাপের ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি হলো নমিনাল জিডিপি (Nominal GDP)। এই পদ্ধতিতে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মোট মূল্যকে বর্তমান বাজার দরের ভিত্তিতে ডলারে রূপান্তর করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ীই ভারত বর্তমানে এক ধাপ পিছিয়ে ষষ্ঠ স্থানে চলে গেছে।
অন্যদিকে রয়েছে ক্রয় ক্ষমতা সমতা বা Purchasing Power Parity (PPP)। এই মাপকাঠিটি মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির পার্থক্য বিচার করে তৈরি করা হয়। মজার বিষয় হলো, পিপিপি-র নিরিখে ভারত কিন্তু এখনও বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজের মজবুত অবস্থান ধরে রেখেছে।
কেন এই র্যাঙ্কিং পতন?
ভারতের এই পিছিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূলত মুদ্রার দরের খেলা কাজ করেছে। বিষয়টিকে কয়েকটি পয়েন্টে বিশ্লেষণ করা যাক:
- টাকার দাম কমে যাওয়া: গত এক বছরে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। ফলে দেশের উৎপাদন যখন ডলারে কনভার্ট করা হচ্ছে, তখন মোট অংকটি আগের চেয়ে কম দেখাচ্ছে।
- ডলারের আধিপত্য: বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের আবহে বিনিয়োগকারীরা ডলারকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে ডলারের চাহিদা ও শক্তি আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
- হিসাব পদ্ধতির পরিবর্তন: জিডিপি গণনার ভিত্তি বছর এবং কিছু পরিসংখ্যানগত সংশোধনের ফলেও এই র্যাঙ্কিংয়ে সামান্য প্রভাব পড়েছে।
- প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান: মুদ্রার মান জাপান বা যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও কমেছে, তবে টাকার তুলনায় তাদের মুদ্রার অবস্থান বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীল। আর এই সুযোগেই তারা ভারতের থেকে সামান্য এগিয়ে গেছে।
বর্তমান লড়াই ও আগামীর লক্ষ্য
গত তিন বছর ধরে ভারত ব্রিটেনকে (UK) পেছনে ফেলে এগিয়ে ছিল। তবে আইএমএফ-এর অনুমান বলছে, আগামী দুটি অর্থবর্ষে ভারত ব্রিটেনের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে থাকতে পারে। বর্তমানে ভারতের জিডিপির আকার প্রায় ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ব্রিটেন ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছুঁইছুঁই।
তবে মুদ্রার এই লড়াইয়ে সাময়িক পিছিয়ে থাকলেও ভারতের উন্নয়নের গতি কিন্তু থমকে নেই। বার্ষিক ৬-৭ শতাংশ বৃদ্ধির হার বজায় থাকলে, ২০৩১ সালের মধ্যে ভারত জাপান ও জার্মানিকে অনায়াসেই টেক্কা দিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মুকুট ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শক্তির জায়গা এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ
ভারতীয় অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কবজি হলো তার অভ্যন্তরীণ বাজার। জিডিপির প্রায় ৫৫-৬০% আসে দেশীয় ব্যবহার বা কনজাম্পশন থেকে। ফলে বিশ্ববাজারে মন্দা চললেও ভারত পুরোপুরি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল নয় বলে বড় ধাক্কা এড়াতে পারে।
এ ছাড়া ভারতের বিশাল যুবশক্তি বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। ইউপিআই (UPI) এবং ফিনটেক ক্ষেত্রে ভারতের ডিজিটাল বিপ্লব আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং পিএলআই (PLI) প্রকল্পগুলোও উৎপাদন শিল্পকে নতুন অক্সিজেন দিচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বিশাল অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও জনসংখ্যার নিরিখে ভারতের মাথাপিছু আয় (Per Capita Income) এখনও বেশ কম। এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং বেকারত্ব দূর করাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি, অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা সরাসরি ভারতের পকেটে টান ফেলে।
