ভারতের অর্থনীতির গতিপথ বুঝতে গেলে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি যারা নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য এই অধ্যায়টি বেশ জটিল মনে হতে পারে। প্রতিটি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য আর মডেলের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। তবে ভয়ের কিছু নেই; বেশ কিছু সহজ কৌশল আর গল্পের ছলে এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার আয়ত্ত করা সম্ভব।
Table of Contents
১ থেকে ৪ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: কৃষক রঘুর জীবনকাহিনি
প্রথম চারটি পরিকল্পনা মনে রাখার জন্য আমরা রঘু নামে একজন সাধারণ কৃষকের গল্প কল্পনা করতে পারি। ১৯৪৭ পরবর্তী সেই অস্থির সময়ে রঘুর জীবন দিয়ে দেশের পরিস্থিতি বোঝা সহজ।
- প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে, চারদিকে তীব্র খাদ্যাভাব। রঘুর প্রথম কাজই ছিল নিজের খেত লাঙ্গল দিয়ে চষে ফেলা আর সেচের জন্য খাল কাটা। ঠিক তেমনই, সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি।
- দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: জমি তো তৈরি হলো, কিন্তু শুধু লাঙ্গল দিয়ে কতটুকু আর হয়? রঘুর এবার উন্নত সরঞ্জাম আর ট্রাক্টর চাই। এই ভাবনা থেকেই সরকার কৃষির পাশাপাশি ভারী শিল্পের ওপর বিশেষ জোর দেয়।
- তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: এবার রঘু আত্মবিশ্বাসী। সে ঠিক করল আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না। নিজের চাষ আর নিজের কলকারখানা দিয়েই সে এগোবে। অর্থাৎ, এই পর্বের মূল মন্ত্র ছিল স্বনির্ভরতা।
- চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: স্বপ্ন থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়াল যুদ্ধ। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াইয়ের পর দেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। তাই পরিকল্পনা করা হলো যে কৃষি ও শিল্পকে এমনভাবে মজবুত করা হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধাক্কা সামলানো যায়। এর ফোকাস ছিল স্থিতিশীলতার সাথে উন্নয়ন।
৫ থেকে ১০ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: শব্দের ম্যাজিক
মাঝের এই পরিকল্পনাগুলোর মূল লক্ষ্য মনে রাখতে আমরা কিছু মজার শব্দ বা ট্রিকস ব্যবহার করতে পারি। নিচে তার একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- পঞ্চম পরিকল্পনা (৫ মানে ‘পাঞ্চ’): দারিদ্র্য আর আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতিকে বক্সিংয়ের মতো একটা ‘পাঞ্চ’ বা ঘুসি মারার কথা ভাবুন। এর মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ।
- ষষ্ঠ পরিকল্পনা (৬ মানে ‘সিক্সথ সেন্স’): সিক্সথ সেন্স বা বুদ্ধির ব্যবহার মানেই হলো প্রযুক্তির ছোঁয়া। এই সময় আধুনিকীকরণ আর প্রযুক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- সপ্তম পরিকল্পনা (৭ মানে ‘সাথ’): সকলকে ‘সাথ’ বা সঙ্গে নিয়ে চলার লক্ষ্য। শহরের পাশে গ্রামকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোই ছিল এর প্রধান কাজ।
- অষ্টম পরিকল্পনা (৮ মানে ‘অষ্টম আশ্চর্য’): ১৯৯১-এর অর্থনৈতিক সংস্কারের পর ভারতের দক্ষ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকেই পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই জোর দেওয়া হয় মানবসম্পদ উন্নয়নে।
- নবম পরিকল্পনা (৯ মানে ‘নাইন’ বা ‘ন্যায়’): নাইন আর ন্যায় শব্দ দুটি শুনতে অনেকটা একই রকম। স্বাভাবিকভাবেই এর লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা।
- দশম পরিকল্পনা (১০ মানে ‘ফুল স্পিড’): গাড়ির স্পিড যখন ১০-এ থাকে, তখন তা পূর্ণ শক্তিতে ছোটে। ঠিক সেভাবেই দেশের শক্তি ক্ষেত্র বা এনার্জি সেক্টরকে চাঙ্গা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
১১তম ও ১২তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: উন্নয়নের শেষ ধাপ
দশম পরিকল্পনার হাত ধরে দেশ যখন অনেকটা স্থিতিশীল, তখন লক্ষ্য ছিল সেই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করা। ১১তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, এই সময়েই ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ৮ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর আসে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চলা ১২তম এবং দেশের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য ছিল আরও দ্রুতগতিতে সকলকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ মডেল ও সময়কাল
পরীক্ষায় প্রথম তিনটি পরিকল্পনার মডেল নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। এগুলি মনে রাখার সবথেকে সহজ উপায় হলো ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম (Alphabetical Order) অনুসরণ করা।
- প্রথম পরিকল্পনা: হ্যারোড ডোমার মডেল (Harrod-Domar)। বর্ণমালায় ‘H’ সবার আগে আসে।
- দ্বিতীয় পরিকল্পনা: মহালনবিশ মডেল (Mahalanobis)। ‘M’ বর্ণটি ‘H’-এর পরে বসে।
- তৃতীয় পরিকল্পনা: সুখময় চক্রবর্তী মডেল (Sukhmoj Chakraborty)। ‘S’ আসে ‘M’-এরও পরে।
তবে একটি বিশেষ তথ্য মাথায় রাখা জরুরি। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের জেরে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের পাতায় এই ৩ বছরকে ‘পরিকল্পনা অবকাশ’ বা ‘প্ল্যান হলিডে’ বলা হয়। অন্যদিকে, সপ্তম পরিকল্পনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল জন ডব্লিউ মিলার মডেল, যার মূল ভাবনা ছিল উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখা।

Leave a Comment
Commenting as ·