Classical and Folk Dances of India: ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বাহক হলো এর বৈচিত্র্যময় নৃত্যশৈলী। যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, বিশেষ করে WBSSC Group C, রেলওয়ে, বা পিএসসি-র পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ‘ভারতের শিল্প ও সংস্কৃতি’ বা Art and Culture বিভাগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাতে প্রায়শই বিভিন্ন রাজ্যের শাস্ত্রীয় ও লোকনৃত্য সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে দেখা যায়। আজকের এই পাঠে আমরা ভারতের প্রধান শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং বিভিন্ন রাজ্যের জনপ্রিয় লোকনৃত্যগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো, যা আপনার সাধারণ জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে।
ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্য (Classical Dances of India)
ভারতীয় সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে ৮টি ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় নৃত্য স্বীকৃত। এই নৃত্যগুলি নির্দিষ্ট ব্যাকরণ ও ঐতিহ্য মেনে চলে। নিচে এই ৮টি শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং তাদের উৎপত্তিস্থল বা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| শাস্ত্রীয় নৃত্যের নাম | সংশ্লিষ্ট রাজ্য / উৎপত্তিস্থল |
|---|---|
| ভারতনাট্যম | তামিলনাড়ু |
| কথক | উত্তর প্রদেশ (উত্তর ভারত) |
| কথাকলি | কেরালা |
| কুচিপুরি | অন্ধ্রপ্রদেশ |
| ওড়িসি | ওড়িশা |
| সাত্রিয়া | আসাম |
| মণিপুরি | মণিপুর |
| মোহিনী আট্টম | কেরালা |
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লোকনৃত্য (Folk Dances)
শাস্ত্রীয় নৃত্যের বাইরে ভারতের প্রতিটি অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব লোকনৃত্য রয়েছে যা তাদের দৈনন্দিন জীবন, উৎসব এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে জড়িত। পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ লোকনৃত্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত:
- বিহু (Bihu): আসামের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকনৃত্য। এটি মূলত তিন প্রকার— রঙ্গালি বা বোহাগ বিহু, কঙ্গালি বা কাটি বিহু এবং ভোগালি বা মাঘ বিহু।
- বাগরুম্বা (Bagurumba): আসামের বোড়ো উপজাতি দ্বারা পরিবেশিত একটি রঙিন নৃত্য।
- সাত্রিয়া ও ওড়িসি: এগুলি শাস্ত্রীয় নৃত্যের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতিরও অংশ।
- জাতা-জাতিন (Jata-Jatin): বিহারের মিথিলা ও কোশী অঞ্চলে বর্ষাকালে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়।
- বিদেশিয়া (Bidesia): বিহারের বিখ্যাত লোকনৃত্য। এটি সৃষ্টি করেছিলেন ভিখারী ঠাকুর, যাকে ‘ভোজপুরি শেক্সপিয়ার’ বলা হয়।
- ঢালি (Dhali): পশ্চিমবঙ্গের একটি লোকনৃত্য, যার উদ্ভব রাজা প্রতাপাদিত্যর শাসনামলে।
- গম্ভীরা (Gambhira): পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে কাঠের মুখোশ পরে শিব-পার্বতীর আখ্যান নিয়ে এই নৃত্য হয়।
- হোজাগিরি (Hojagiri): ত্রিপুরার রিয়াং সম্প্রদায়ের মহিলাদের দ্বারা পরিবেশিত ভারসাম্যমূলক নৃত্য।
- লাই হারাওবা (Lai Haraoba): মণিপুরের মেইতি সম্প্রদায়ের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য।
- নংরেম (Nongkrem): মেঘালয়ের খাসি উপজাতির উৎসবের নৃত্য।
- চুফাট (Chu Faat): সিকিমের লোকনৃত্য।
- বর্দছাম (Bardochham): অরুণাচল প্রদেশের বৌদ্ধ উপজাতিদের দ্বারা পরিবেশিত নৃত্য।
- পাইকা ও মুন্ডারি: ঝাড়খন্ডের মুন্ডা উপজাতির জনপ্রিয় নৃত্যশৈলী।
পশ্চিম ও মধ্য ভারত:
- গর্বা (Garba): গুজরাটের অত্যন্ত জনপ্রিয় লোকনৃত্য, যা নবরাত্রির সময় মহিলারা পরিবেশন করেন। এটি ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তালিকায় স্থান পেয়েছে।
- ডান্ডিয়া রাস (Dandiya Raas): গুজরাটের এই নৃত্যে দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে লাঠি বা ডান্ডিয়া ব্যবহার করা হয়।
- তামাশা ও লাভনি: মহারাষ্ট্রের জনপ্রিয় লোকনৃত্য ও লোকনাট্য।
- গাফা (Gafa): মহারাষ্ট্রের আরেকটি লোকনৃত্য।
- ফুগুড়ি (Fugdi): গোয়ার মহিলারা মারাঠি ও কঙ্কনি গানের তালে এটি পরিবেশন করেন।
- তরঙ্গমেল (Tarangamel): গোয়ার একটি উৎসবমুখর নৃত্য।
- মটকি (Matki): মধ্যপ্রদেশের নারীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাটির পাত্র মাথায় নিয়ে এই নৃত্য করেন।
- রাউত নাচা (Raut Nacha): ছত্তিশগড়ের যাদব সম্প্রদায় বা গোপালকদের দ্বারা পরিবেশিত নৃত্য।
- ঘুমর (Ghoomar): রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, যা মূলত ভিল উপজাতিরা শুরু করেছিল।
উত্তর ভারত:
- নউটাঙ্কি (Nautanki): উত্তর প্রদেশের লোকনাট্য ও নৃত্য।
- রাসলীলা: এটি উত্তর প্রদেশের ব্রজ অঞ্চলের লোকনৃত্য (অনেকে এটিকে রাজস্থানের সাথে গুলিয়ে ফেলেন)।
- লুরি (Luri): পাঞ্জাবের লোকনৃত্য।
- গুগ্গা (Gugga): হরিয়ানায় সাধক গুগ্গার স্মরণে শোভাযাত্রার মাধ্যমে এই নৃত্য হয়।
- ফাক (Phag): হরিয়ানার কৃষকরা ফসল কাটার সময় (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) এটি পালন করেন।
- নাটি (Nati): হিমাচল প্রদেশের লোকনৃত্য।
- রউফ (Rouf): জম্মু ও কাশ্মীরে ঈদ বা রমজানের সময় এটি নারীরা পরিবেশন করেন।
দক্ষিণ ভারত:
- যক্ষগান (Yakshagana): কর্ণাটকের একটি ধ্রুপদী থিয়েটার ধর্মী নৃত্য, যেখানে বিশেষ পোশাক, ভারী মেকআপ এবং সংলাপের ব্যবহার দেখা যায়।
- কোলাটাম (Kolattam): অন্ধ্রপ্রদেশের একটি দলবদ্ধ লোকনৃত্য।
- ধীমসা (Dhimsa): অন্ধ্রপ্রদেশের পরজা উপজাতির মহিলারা এটি পরিবেশন করেন।
- থেইয়াম (Theyyam): কেরালার মালাবার অঞ্চলের এই নৃত্য ‘কালিয়াত্তম’ নামেও পরিচিত। এতে দেবী কালীর রূপ ও গল্প তুলে ধরা হয়।
- লাভা (Lava): লাক্ষাদ্বীপের লোকনৃত্য।
পরীক্ষা বিশেষ: কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Exam Special Facts)
নৃত্যের তালিকার বাইরেও কিছু বিশেষ তথ্য প্রায়ই পরীক্ষায় জিজ্ঞাসা করা হয়। নিচে সেগুলি পয়েন্ট আকারে দেওয়া হলো:
- ছৌ নাচ (Chhau Dance): পূর্ব ভারতের এই মুখোশ নৃত্যটি তিনটি ভিন্ন শৈলীতে দেখা যায়:
- পুরুলিয়া ছৌ (পশ্চিমবঙ্গ)
- ময়ূরভঞ্জ ছৌ (ওড়িশা)
- সরাইকেলা ছৌ (ঝাড়খণ্ড)
- গোটিপুয়া (Gotipua): ওড়িশার রঘুরাজপুরে এই নৃত্য দেখা যায়। এখানে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেরা মেয়েদের পোশাক ও সাজসজ্জা করে নাচ করে।
- কোনারক নৃত্য উৎসব: ওড়িশার বিখ্যাত সূর্য মন্দিরের পটভূমিতে এই উৎসব পালিত হয়। উল্লেখ্য, কোনারক মন্দির ১৯৮৪ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়।
- মণিপুরি নৃত্যের বৈশিষ্ট্য: ‘সংকীর্তন’ এবং ‘রাস’ হলো মণিপুরি নৃত্যের প্রধান দুটি অঙ্গ।
- কথাকলি: এই নৃত্যে মহাভারত, রামায়ণ এবং পুরাণের পৌরাণিক কাহিনীগুলি মূকাভিনয় ও নৃত্যের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়।
- কথক ও থুমড়ি: উত্তর ভারতের কথক নৃত্যের সাথে ‘থুমড়ি’ সঙ্গীত শৈলীটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- দাদরা তাল: হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় দাদরা তালে মোট ৬টি মাত্রা বা নোট থাকে।
ভারতের এই বিশাল সাংস্কৃতিক ভান্ডার থেকে বাছাই করা এই তথ্যগুলো নিয়মিত অনুশীলন করলে পরীক্ষায় ভালো ফল করা সহজ হবে। নাচের নাম এবং তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নাম মনে রাখার জন্য তালিকাটি বারবার পড়ুন।
