Teacher Interview Questions And Answers Guide: শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় লিখিত পর্বের পরেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—ইন্টারভিউ বা পার্সোনালিটি টেস্ট। এখানে কেবল আপনার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান পরীক্ষা করা হয় না, বরং দেখা হয় আপনার মানসিক স্থৈর্য, উপস্থিত বুদ্ধি, মূল্যবোধ এবং বিতর্কিত পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা। অনেক সময় ইন্টারভিউ বোর্ড এমন কিছু প্রশ্ন করেন যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, তার উত্তর দেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে মূলত আপনার দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয়।
শিক্ষক ইন্টারভিউয়ের বিতর্কিত প্রশ্নের কৌশলী উত্তর
একজন হবু শিক্ষক হিসেবে ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজেকে সঠিক ও মার্জিতভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে পাঁচটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু কৌশলী প্রশ্নের নমুনা এবং সেগুলোর আদর্শ উত্তর নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজা পালন বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রশ্ন: “আপনি কি বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজা আয়োজন করাকে সমর্থন করেন?”
এই প্রশ্নটি ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য দাবি করে। সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলাটা এখানে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আদর্শ উত্তর:
“অবশ্যই স্যার, আমি বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজা পালনকে সমর্থন করি। তবে আমি বিষয়টিকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখি না, বরং এটিকে আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করি। বিদ্যালয় একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্থান, তাই এখানে এই উৎসবটি এমনভাবে পালিত হওয়া উচিত যাতে এটি একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত শিক্ষার্থী আনন্দ করতে পারে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।”
উত্তরের মূলমন্ত্র:
- বিষয়টিকে ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বের করে সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপান্তর করা।
- সকল ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া।
- ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
২. শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য
প্রশ্ন: “আপনার মতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী?”
বইয়ের সংজ্ঞা না দিয়ে নিজের মতো করে একটি অর্থবহ উত্তর তৈরি করুন যা আপনার শিক্ষকতার দর্শনের সাথে মেলে।
আদর্শ উত্তর:
“শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশ। এটি কেবল পুঁথিগত জ্ঞান অর্জন নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানো। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। সংক্ষেপে, আনন্দময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে মূল্যবোধ ভিত্তিক চরিত্র গঠনই শিক্ষার উদ্দেশ্য।”
৩. আদর্শ বিদ্যালয়ের ধারণা
প্রশ্ন: “আপনি কেমন বিদ্যালয় চান বা একটি আদর্শ বিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত?”
এই প্রশ্নের উত্তরটি শিক্ষার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
আদর্শ উত্তর:
“আমি এমন একটি বিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখি যা চার দেওয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের পাঠশালা হয়ে উঠবে। আদর্শ বিদ্যালয়ে:
- শিক্ষক হবেন বন্ধুর মতো পথপ্রদর্শক, ভয়ের পাত্র নন।
- শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে যুক্তি দিয়ে ভাবতে শিখবে।
- ক্লাসরুম হবে সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তার স্থান।
- শিক্ষার পরিবেশ হবে ভয়মুক্ত এবং আনন্দদায়ক, যেখানে প্রতিটি শিশু তার সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে।”
৪. নিজের সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন (সরকারি বনাম বেসরকারি)
প্রশ্ন: “আপনি আপনার সন্তানকে ভবিষ্যতে সরকারি স্কুলে পড়াবেন নাকি বেসরকারি স্কুলে?”
এটি একটি অত্যন্ত বড় ফাঁদ। আপনি সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে সরকারি স্কুলের সমালোচনা করতে পারেন না, আবার নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের প্রশ্নে মিথ্যেও বলা কঠিন হতে পারে।
আদর্শ উত্তর:
“স্যার, আমি আমার সন্তানের জন্য এমন একটি বিদ্যালয় বেছে নেব যেখানে শিক্ষার পরিবেশ এবং মান উন্নত। আমার কাছে সরকারি বা বেসরকারি ‘ট্যাগ’-এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেখানে সে নৈতিক মূল্যবোধ শিখছে কিনা, তার চরিত্র গঠন হচ্ছে কিনা এবং সে আনন্দ নিয়ে শিখছে কিনা। যদি কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে আমি উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং আন্তরিক শিক্ষক পাই, তবে অবশ্যই আমি গর্বের সাথে তাকে সেখানে ভর্তি করব। প্রতিষ্ঠান সরকারি না বেসরকারি তার চেয়ে শিক্ষার গুণমানই আমার কাছে অগ্রাধিকার পাবে।”
কৌশল:
এখানে আপনি সরাসরি কোনো পক্ষ নিলেন না, বরং ‘শিক্ষার গুণমান’-এর ওপর জোর দিয়ে নিজের সচেতন অভিভাবক সত্তার পরিচয় দিলেন।
৫. শিক্ষকদের অশৈক্ষিক কাজ (যেমন ভোটের ডিউটি)
প্রশ্ন: “শিক্ষকদের ভোটের ডিউটি বা মিড-ডে মিলের মতো অ-শিক্ষকসুলভ কাজে যুক্ত করাকে আপনি কীভাবে দেখেন?”
সরকারের সমালোচনা না করে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়াই এখানে কাম্য।
আদর্শ উত্তর:
“স্যার, একজন শিক্ষক হিসেবে আমার প্রধান কাজ অবশ্যই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান। যখন নির্বাচন বা অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত হতে হয়, তখন পাঠদানের স্বাভাবিক ছন্দে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও আমাদের দেখতে হবে। ভোট বা জনগণনা রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একজন সরকারি কর্মচারী এবং দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের এই বৃহত্তর স্বার্থে অবদান রাখাটা আমি আমার নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলেই মনে করি। তাই সাময়িক অসুবিধা হলেও, আমি এটিকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করব।”
একনজরে: কী করবেন আর কী করবেন না
ইন্টারভিউতে সঠিক ইম্প্রেশন তৈরি করার জন্য নিচের ছকটি মনে রাখুন:
| বর্জনীয় (যা করবেন না) | করণীয় (যা করবেন) |
|---|---|
| সরাসরি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পক্ষ নেওয়া। | নিরপেক্ষ এবং উদার মানসিকতার পরিচয় দেওয়া। |
| সরকার বা সিস্টেমের তীব্র সমালোচনা করা। | গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারসাম্য বজায় রাখা। |
| কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ তে উত্তর দেওয়া। | উত্তরের সপক্ষে ছোট এবং শক্তিশালী যুক্তি দেওয়া। |
| আবেগপ্রবণ হয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়া। | শান্ত থেকে বিনয়ের সাথে নিজের মত প্রকাশ করা। |
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ইন্টারভিউ বোর্ডে আপনার জ্ঞান যাচাইয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি পরিস্থিতি কীভাবে সামলাচ্ছেন। উত্তরগুলো এমনভাবে সাজান যাতে আপনার ইতিবাচক মানসিকতা, পেশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং বাস্তববাদী চিন্তাধারা প্রকাশ পায়।
